গত মাসে আমার স্ত্রীকে নিয়মিত চেকআপের জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিছু জটিলতার কারণে ডাক্তার তখনই সিজারের জন্য ভর্তি হতে বলেন। আমরা দেরি না করে সেদিনই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাই।
যারা আগে কখনো এই হাসপাতালে যাননি, তাদের কাছে হাসপাতালের রঙিন লেবেল, বইয়ের মতো হেলথ রেকর্ড, জুতা খুলে হাসপাতালে প্রবেশ করা, হুইলচেয়ার এক্সেসিবল সিড়ি, মহিলা ওয়ার্ডে কোনো পুরুষের ঢুকতে না পারার মতো বিষয়গুলো অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু গত এক বছরে আমাদের পরিবারেই দুইজন শিশুর জন্ম হয়েছে এই হাসপাতালে। আমার ভাগ্নী ও চাচাতো বোন, দুইজনেরই এখানে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। তাছাড়া আমার স্ত্রীকেও শুরু থেকেই এই হাসপাতালেই ফলোআপে রাখা হয়েছিল। তাই হাসপাতালটি আমাদের কাছে অনেকটাই পরিচিত।
গত মাসে যখন ভর্তি হই, তখন ওয়ার্ডের ডাক্তাররা সিজার বা ডেলিভারি নিয়ে খুব বেশি জোর করেননি। সাধারণ ফলোআপেই রাখছিলেন। দুই-তিন দিন ভর্তি থাকার পর যখন অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলো, তখন আমাদের গাট ফিলিং বলছিল এখন হয়তো সিজার করে ফেলা উচিত হবে না। যেহেতু খুব বেশি সমস্যা ছিল না, আমার স্ত্রী টার্ম শেষে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করতে চাচ্ছিলো।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মূল পরিচিতি হলো নরমাল ডেলিভারিতে তাদের সাকসেস। আমাদের পরিবারেও এমন একটি হাই-রিস্ক প্রেগন্যান্সি ছিল, যেটি অন্য সব ডাক্তার সিজার করতেই হবে বলে জানিয়েছিলেন। সেটিও আদ্-দ্বীন হাসপাতাল খুব সহজেই নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পেরেছিল। এজন্যই হাসপাতালটি আমাদের পছন্দের তালিকায় ছিলো।
আমরা গত মাসে যেদিন হাসপাতাল থেকে চলে আসি, সেদিনই হাসপাতালের নিচে অনেক সাংবাদিক ও পুলিশ দেখতে পাই। পরে জানতে পারি, সেটি ছিল সেই ছয়টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা কেন্দ্রিক।
আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া যে সেবার আমরা সিজার না করেই চলে আসতে পেরেছিলাম। যদি অপারেশন করা হতো, তাহলে আমার স্ত্রী ও মেয়েও হয়তো ঘটনার দিন সেই পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডেই থাকত।
সেবার চলে আসার পর অনেকেই এই হাসপাতালে আবার না যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের আগের অভিজ্ঞতা খুব বেশি খারাপ ছিল না। তাছাড়া আমার স্ত্রীর কিছু জটিলতা ছিল, যেগুলো শুরু থেকেই আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ফলোআপে রাখা হয়েছিল। শেষ সময়ে অন্য হাসপাতালে গেলে হয়তো সব কিছু পুনোরায় এসেস করতে অনেক সময় লেগে যেতো। তাই এবার ৮ তারিখ রাতে যখন আমার স্ত্রীর লেবার পেইন শুরু হলো, আমরা আবার আদ্-দ্বীন হাসপাতালেই গেলাম।
সারাদিন লেবার পেইন সহ্য করল আমার স্ত্রী। রাতের দিকে অবস্থার কিছুটা অবনতি হতে দেখে এবং আমার স্ত্রীর মেডিকেল হিস্ট্রি বিবেচনায় নিয়ে তারা এবার অপেক্ষা না করে সিজারের পরামর্শ দিলেন। আমরাও আর দেরি না করে সিজার করার সিদ্ধান্ত নিই।
মা-কে কয়েক ঘণ্টা পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে অবজারভেশনে রাখা হয় এবং বাবুকে এনআইসিইউতে রাখা হয়। এরপর শেষ পর্যন্ত তাদের জেনারেল ওয়ার্ডে শিফট করা হয়। আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে সবকিছু ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।
আমার স্ত্রী এখনো সেই হাসপাতালেই আছে। সঙ্গে আছে আমার মা ও শাশুড়ি। আজ বিকেলে যখন এই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়, তখন আমি হাসপাতাল থেকে অফিসের কাজ সারতে বাসায় আসছিলাম। এরই মধ্যে এই খবর শুনতে পাই। যদিও সকাল থেকেই হাসপাতালে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং সাংবাদিকদের ক্যামেরার উপস্থিতি দেখে কিছুটা আঁচ করতে পারছিলাম।
সন্ধ্যার দিকে নার্সরা নাকি ভর্তি থাকা রোগীদের অনানুষ্ঠানিকভাবে অন্য হাসপাতাল খুঁজে রাখতে বলেছেন, কারণ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে।
আমার স্ত্রী এখন রিকভারিতে আছে। হাসপাতাল পরিবর্তন করতে হলেও খুব বেশি সমস্যা হবে না। কিন্তু এই হাসপাতালে আরও অনেক জটিল রোগী ভর্তি আছে। এই অবস্থায় তাদের অন্য হাসপাতালে ট্রান্সফার করা কতটা কঠিন, সেটা যারা এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়নি, তাদের বলে বোঝানো যাবে না। আমার স্ত্রী সুস্থ থাকলে হয়তো কাল তাকে অন্য হাসপাতালে না নিয়ে বাসায় নিয়ে আসব। কিন্তু যারা লেবার পেইন নিয়ে বা কমপ্লিকেশন নিয়ে ভর্তি হয়েছে, তাদের কী হবে?
আশা করি কর্তৃপক্ষ পেন্ডিং কেসগুলো ক্লোজ করা পর্যন্ত হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রাখতে দেবেন।
হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা ঠিক হলো কি না, সে বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। এসব আমার পে গ্রেডের বাইরে। তবে সেই মৃত্যুর ঘটনায় দায়ী কর্তব্যরত স্টাফ বা চিকিৎসকদের কোনো বড় শাস্তি হয়েছে কি না, তা জানি না। সেটা আগে হওয়া দরকার ছিল।
সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা এই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল চাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের। তাদের হয়তো কোনোদিনও এই হাসপাতালে যেতে হবে না। তাদের এই চাওয়াটা ভুল না হলেও অনেকটাই আবেগতাড়িত। আসলে এমন একটা দুঃখজনক সংবাদ শুনে আবেগতাড়িত হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রতিষ্ঠানের প্রতি রাগ-ক্ষোভ জন্মানোই স্বাভাবিক।
তবে এই হাসপাতালটি নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য একটি আশীর্বাদ ছিল। মোটামুটি কম খরচে চিকিৎসা এবং নরমাল ডেলিভারির জন্য এই হাসপাতাল ঢাকার অনেক প্রাইভেট হাসপাতালের কাছেই ঈর্ষার কারণ। এই খরচে এমন পরিবেশ পাওয়াটা সত্যিই আশীর্বাদ; কারণ অন্যান্য প্রাইভেট হাসপাতালে খরচ এর কয়েকগুণ, আর সরকারি হাসপাতাল বা সমসাময়িক ক্লিনিকগুলোর পরিবেশ আমরা সবাই কমবেশি জানি।
তাছাড়া পর্দা মেনে চলা অনেক পরিবারের জন্য এটিই ছিল একমাত্র ভরসার জায়গা। আমার জানামতে, ঢাকার প্রায় সব হাসপাতালেই জেনারেল মহিলা ওয়ার্ডে দিনের বেলায় পুরুষেরা প্রবেশ করতে পারেন। যাদের প্রাইভেসি দরকার হয়, তাদের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কেবিন ভাড়া করা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু পর্দা মেনে চলা যেসব পরিবারের কেবিন নেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ছিল একটি নিরাপদ ভরসার জায়গা; কারণ এখানে মহিলা জেনারেল ওয়ার্ডে কোনো পুরুষের প্রবেশের সুযোগ নেই।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের অনেক সমস্যা আছে। এসব সমস্যার জন্য অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। কোনো ছাড়ের সুযোগ নাই। তবে সেটি হওয়া উচিত ছিল মূলত ব্যক্তি-কেন্দ্রিকভাবে। যাদের গাফিলতিতে মৃত্যু হয়েছে, সে নার্স, স্টাফ, ডাক্তার বা বিল্ডিংয়ের ইঞ্জিনিয়ার যেই হোক, তাদের চাকরিচ্যুত করা এবং আইনানুগ মামলা ও শাস্তির আওতায় আনা উচিত ছিল।
সেটা হয়তো হয়নি। কিন্তু এরকম ব্যতিক্রমধর্মী একটি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে অনেক পরিবারের শেষ ভরসার জায়গাটিও হারিয়ে যাবে, এটাই সবচেয়ে কষ্টের বিষয়।