মক্কায় উমরাহের নিয়তে আমার সাথে আমার ফ্যামেলির তিনজন মহিলা ছিলেন বিধায় মসজিদ আল-হারামের একদম কাছে একটা হোটেল বুকিং করি। মসজিদ আল-হারামের সাথে সরাসরি বাউন্ডারি শেয়ার করে এমন হোটেলের সংখ্যা খুব কম। তাই এই হোটেলটা আমার জন্য পারফেক্ট ছিল। হোটেল থেকে বের হলেই হারাম শরিফ।
হোটেলে পৌঁছানোর পর হোটেলের রিসেপসনিস্ট থেকে রুম সার্ভিস স্টাফ, রুম — সব কিছুই ভালো ছিল। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টও ফাইভ-স্টার স্ট্যান্ডার্ডের ছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম হোটেলের এন্ট্রেন্সে গার্ড আমার কাছে রুম কি দেখতে চাচ্ছেন। প্রথমদিকে তেমন কিছু মনে হয় নাই। রুম কি দেখিয়ে ঢুকে যেতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে খেয়াল করলাম সে শুধু আমার এবং আমার মতো দেখতে যেইসব গেস্ট, সংখ্যায় খুবই সামান্য, তাদের কাছে রুম কি কার্ডগুলো দেখতে চাচ্ছে। ওয়েস্টার্ন গেস্ট এবং সাদা চামড়া আরবদের কোনো কিছু জিজ্ঞেস বা প্রশ্ন করা ছাড়াই ঢুকতে দিচ্ছেন।
ইংরেজি এক্সেন্ট দেখে সেই গার্ডগুলোকে এরাবিয়ান বা মিডল ইস্টার্নই মনে হলো। আর আরবদের ইন্ডিয়া, পাকিস্তান আর বাংলাদেশিদের কামলা হিসেবে দেখাটা নতুন না। আল সাফওয়া টাওয়ারে দুপুরে খেতে গিয়ে এক আরবের সাথে বাংলাদেশি ক্লিনাররের ভূল বসত ধাক্কা লেগে যাওয়াতে আরব ব্যক্তিটির ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশি ক্লিনারকে এস্কেলেটরে পরে যেতে দেখে আমার পরিবার খুবই আশ্চর্য হলেও আমি এসব ঘটনা অনেক আগে থেকেই শুনে আসছি।
তাই হোটেলের আরব গার্ডদের ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের প্রতি এই হীনমন্যতা স্বাভাবিকই লেগেছে আমার। হবেই না কেন? হারাম শরিফের আশে পাশে বেশিরভাগ ভিক্ষুক-ই আমার মতো দেখতে ভারতীয়, পাকিস্তানি কিংবা বাংলাদেশি; অল্প কিছু সুদানি।
তবে সহ্যের সীমা সেদিন ছাড়িয়ে গিয়েছিল যেদিন শুক্রবার জুম্মা থেকে মাগরিব পর্যন্ত প্রায় ৬ বার কার্ড দেখিয়ে হোটেলে ঢুকতে হয়েছে। এমন না যে গার্ডরা আমাকে চিনতে পারে নাই। আমি পুরোপুরি সাদা ফতুয়া ও পায়জামার সাথে খুবই রেকগনাইজেবল ক্যাপ্টেইনস ক্যাপ পড়ে থাকতাম। আমার মনে হয় না পুরো মক্কা-মদিনায় এই টাইপের ক্যাপ কোথাও কারো মাথায় বা কোনো শপে দেখেছি। তাই আমাকে গুলিয়ে ফেলার প্রশ্নই ওঠে না।
উমরাহের ব্যস্ততায় মনে ছিল না। কিন্তু হোটেল থেকে চেক আউট করার সময় সেই গার্ডদের দেখে ঘটনাগুলো মনে পড়লো। তাই এয়ারপোর্টে ওয়েট করতে করতে একটা রিভিউ লিখে দিলাম তাদের গুগল বিজনেস প্রোফাইল বা গুগল ম্যাপে।
“For lack of a better word, some of the hotel staff were extremely “racist”. I stayed there for six nights, and on some days, I had to present my room key to the guard at the entrance no less than 10 times to prove I was a guest, whereas people with Arabian/White/Western attributes, who were also entering the premises with me, were allowed to enter without any questioning. They did the same to my family and others who looked like me. I have traveled to many countries around the world and stayed in the best of hotels, yet this is the only one where I felt like I didn’t belong.”
এরপর ফ্লাইটে চড়ে গেলাম। ৮ ঘন্টার ফ্লাইট শেষ করে বাংলাদেশে পৌঁছে ফোন চালু করে দেখি সৌদি নাম্বার থেকে মিসড কল। আমি মনে করলাম সৌদিতে আমাদের ড্রাইভার কল করেছিলো ঠিক মতো পৌঁছেছি কিনা চেক করার জন্য। বাসায় গিয়ে কল ব্যাক করবো বলে ঠিক করি। কিন্তু ফ্রেশ হয়ে টায়ার্ড শরীর নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ি। বিকেলে হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গে সৌদি আরবের ঐ নাম্বার থেকে কল পেয়ে।
প্রথমে আমাদের পাকিস্তানি ড্রাইভার মনে করে উর্দু-হিন্দিতে কথা শুরু করি। কিন্তু দেখি ওপারে একজন ভদ্র মহিলা ইংরেজিতে কথা বলছেন। উনার ইংরেজি এক্সেন্ট শুনে বুঝতে সমস্যা হয় নি যে উনি একজন আরব। আরবদের ইংরেজি এক্সেন্ট নাইজেরিয়ান বা ভারতীয়দের মতো খুবই রেকনাইজেবল। তখন দুইয়ে দুইয়ে মিলিয়ে ফেলি যে উনি হয়তো সেই হোটেল থেকেই বলছেন। উনার পরিচয় দিয়ে উনি বললেন যে উনি হোটেলটির কোয়ালিটি গেস্ট রিলেশন ম্যানেজার।
প্রথমে উনি সম্পূর্ণ ঘটনা জানতে চাইলেন। সব কিছু খুলে বললাম। দিন, ক্ষণ, পাত্র সহ সব কিছু শেয়ার করলাম। সব কিছু শোনার পর উনার কথার সারমর্ম হচ্ছে – উনারা খুবই দুঃখিত এই ঘটনার জন্য এবং উনি আসলে কোনো এক্সিউজ দেয়ার জন্য কল করেনি, ক্ষমা চাওয়ার জন্য কল করেছেন। উনি আশ্বস্ত করেছেন যেই এই বিষয়টি ম্যানেজমেন্ট খুবই সিরিয়াসভাবে দেখছেন এবং গার্ডদের এই ব্যবহারটা উনি সরাসরি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। পরিশেষে ক্ষমাস্বরুপ আমার পরবর্তী ভিজিটে আমার পুরো স্টে-তে আমার রুম আপগ্রেড করে দিতে চেয়ে আমার সাথে কথা শেষ করেছেন।
কল শেষে খুবই ভালো লাগছিলো। এই জন্য না যে ফ্রি-তে রুম আপগ্রেড করে দিবে। আমার আর কোনোদিন ঐদিকে যাওয়া হবে কিনা সেটা কে জানে?
তবে এই ভেবে ভালো লাগলো যে my words matter. My opinion matters. Probably not in this part of the world, but everywhere else.
তাই নিজের মতামত লিখতে ভুলবেন না। আমার ছোট্ট একটা রিভিউ যদি মক্কার এত বড় একটা ফাইভ স্টার হোটেলের ম্যানেজমেন্টকে তাদের পলিসি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে, চিন্তা করুন আপনার কথায় কত বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই লিখুন, জানান — অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন।
